শীর্ষ খবর

img


বিষয় যদি র‍্যাগিং
আমার জীবনের প্রথম র‍্যাগিং এর অভিজ্ঞতা বুয়েটে। কর্তব্যরত শিক্ষককে শ্রেণীকক্ষ থেকে বের করে দিয়ে প্রথমে চার ঘণ্টা একটা জানালাহীন ঘরে তালা দিয়ে আটকে রাখা হলো। তারপর মেয়েদের কাঠের এবং ছেলেদের লোহার টুল মাথায় নিয়ে একতলা থেকে চারতলা ওঠানামা করানো হলো।

তারপর?

চার হাতপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে একটি স্টুডিও বা ক্লাসঘরে ঢুকতে বাধ্য হওয়া, হামা দিয়ে ছাড়া যেন ঢোকা না যায় সেজন্য বড় বড় লোহার টেবিল দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে দরজার মুখটা। প্রত্যেকে চার পায়ে ঢুকবে, এই টেবিলের তলা দিয়ে।

টেবিলের ওপর উৎসাহী ভাইয়ারা ময়দা, ডিম, নীলের গুঁড়ো, মুরগী-খাসি-গরুর হাড়, চকের গুঁড়ো নিয়ে অপেক্ষা করছে। যে যে ঢুকবে তার মাথা এবং শরীরে মাখিয়ে দেয়া হবে।

র‍্যাগিং-এর আগে কোন মেয়ে যেন বড় গলার কামিজ পরে না আসে, সেই বিষয়ে আগেভাগেই আপারা জানিয়ে দিয়েছিল... এরপর এক ক্লাস বোঝাই সিনিয়রদের সামনে দাঁড়ানো। কেউ কিছু করতে অস্বীকার করলে অকথ্য গালি আর চড়-থাপ্পড়ও আছে, আছে গায়ে-মাথায় ঢিল আর ভুক্তাবশেষ হাড় ছুঁড়ে মারা।


এরপর যা যা আমাদের করতে বলা হলো, লিখতে বলা হলো, বলতে বলা হলো আর যে নামে আমাদেরকে ডাকা হলো, সেই গল্প আরেক দিনের। সবচেয়ে সাধারণ গল্পটাই একটু বলা যেতে পারে।

আমার এক সহপাঠিনীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "এই তুই খালি না ভরা?"

সে মিনমিন করে বলেছিল, "খালি।"

আর হৈহৈ করতে করতে সিনিয়র ছেলেরা বলেছিল, "তুই খালি থাকলেই কী, ভরা থাকলেই কী!" আমার সেই বন্ধু যাকে বলে 'দেখতে ভাল নয়', সে যে মাথা নিচু করে তিক্ত চোখের পানি ফেলেছিল তা আমি কখনো ভুলব না।

আমার মনে আছে, পলাশী থেকে মিরপুর পুরোটা রাস্তা আমি অপমানে ডুকরে কেঁদেছি। ঘরে ঢুকছি, আব্বা হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার মাথা বোঝাই ময়দা আর নীলে, ধুলায় আর খড়িতে ভরা জামা, আমার চোখ লাল। আমার মুখ বেঁকে গেছে রাগে।

ও আচ্ছা, আমাদের এক স্যারের মেয়ে ভর্তি হবার বছর থেকে ফ্যাকাল্টিতে র‍্যাগিং বন্ধ করা হয়েছে। খবরের কাগজে আবরারের মৃতদেহ দেখে আমি একটুও চমকাইনি।

ছবির কপিরাইটSOPA IMAGES
Image caption
ভীতিকর ক্যাম্পাস: আবরার হত্যার প্রতিবাদে ঢাকার বুয়েটের দেয়ালে গ্রাফিতি।
বিষয় যদি শিক্ষক
''বুয়েটের ভিসি: সরকারের সর্বমহল জানে আমি কি করেছি

শিক্ষার্থীরা: স্যার, আমরা জানিনা( চিল্লায়ে)!

ভিসি: আমি জবাবদিহিতা করতে আসিনি

শিক্ষার্থী (রাইসা): সবাই সন্তুষ্ট স্যারের কথায়?

ভিসি: রাইসা..."

আমি এইটুকু পড়লাম ফেসবুকে। এরপর কী হতে পারে তা আমার মুখস্থ। এই রাইসাকে অকুস্থলে জিজ্ঞেস করা গেল না— "এই মেয়ে, তোমার রোল নাম্বার কত?" সেটাই স্যারের জন্য দুঃখের বিষয়। পরে অবশ্য সেই দুঃখের দিন কেটে যাবে।

কে কে স্যারদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিল, কে কে ঐসব ছেলেদের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়েছিল সেইসব তালিকা করা হবে। তদন্ত কমিটি হবে। সেখানে রাইসার নাম থাকবে।

রাইসার অনুষদের নবীনতম শিক্ষক-শিক্ষিকারাও (যাদের ন্যায়-অন্যায় বোধ তখনো অবশিষ্ট আছে বলে ভাবা যেতে পারতো) ক্লাসে এসে বলবে — "ভাবতে আমাদের লজ্জায় মাথা কাটা যায় যে আমাদের ফ্যাকাল্টির ছাত্রছাত্রীর নাম তদন্ত কমিটির তালিকায় আছে।''

ছবির কপিরাইটNURPHOTO
Image caption
প্রতিবাদী প্রজ্বলন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা মোমবাতি জালিয়ে আবরার হত্যার প্রতিবাদ করেন।
তদন্ত কমিটিতে অবশ্যই সেইসব স্যার থাকবেন, যিনি/যারা বলতেন— "আওয়ারাগার্দি করতে এসেচ্চো বুয়েটে তাই ন্না? ছনি মরছে ছনি মরছে ছনি তুমাদের কী ল্লাগে? সপগুলাকে একসাতে ফেল করায়া দিব..."

স্যার তদন্ত কমিটির নামে জিজ্ঞেস করবেন, "রাইছা এই ছ্যালেদের কারা কারা তুমার আসল শত্রু? কারা তুমার গায়ে হাত দিয়েছে, মানে ধরো সিঁড়িতে যাইতে যাইতে কনুই দিয়া বুকে টাচ করেছে এমন।'' (স্যার কনুইয়ের ভঙ্গি দিয়ে দেখাবেন)

তদন্ত কমিটিতে রাইসার উত্তরগুলিই লেখা হবে, রাইসাকে করা প্রশ্নগুলি লেখা হবে না। তদন্ত কমিটির কোনো এক ম্যাডাম রাইসাকে ফোন দিয়ে বলবেন, "যাদের নাম তুমি বলেছ, তাদের কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারে, ভাল হয় তুমি যদি ফ্যাকাল্টিতে কয়েকদিন না আসো।'' আরেক স্যার বলবেন, "এই মেয়ে ক্যামনে পাশ করে আমরা দেখব! ফ্যাকাল্টির বদনাম করলো, বুয়েটের ভাবমূর্তি নষ্ট কল্লো!"

হাজার হাজার ছেলেমেয়ে থেকে ছেঁকে নেয়া কয়েকশত ছেলেমেয়ের ভিতরের একজন রাইসা। সে এইভাবে হয়তো পাশ করবে, নয়তো কয়েকবারে পাশ করবে, নয়তো জীবনের প্রথম সেকেন্ড ক্লাস পাবে, নয়তো তার সেই ক্লাসমেট মেয়েটির মতো কোনোদিন পাশ করবে না (যে মেয়েটা তার সহপাঠীর দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিল কিন্তু ভয়ে টুঁ শব্দ করেনি,ভয়ানক ট্রমায় সে আর পাশ করতে পারেনি।)।

"পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে আমরা যুদি চাই, এক দিনে সব্বাইরে ফেল করায়ে দিতে প্পারি... দেখতে চাও তুমরা?"

দেখি তো স্যার। দেখলাম তো স্যার। সেই একই আপনি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে দয়ার সাগর হয়ে যান, ছাত্রদের পরীক্ষার রেজাল্টে মার্ক ২০% বাড়িয়ে দিয়ে পাশ করাতে বলেন, যেখানে পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে আপনার পায়ে পায়ে আপনার ছাত্র কাঁদে— আপনি তার নাম্বার যোগ করতে ভুল করেছেন সেটা যে সে ধরিয়ে দিয়েছিল সেই অন্যায় যেন আপনি মনে না রাখেন।

ছবির কপিরাইটNURPHOTO
Image caption
হত্যার প্রতিবাদ: বিক্ষোভে নেমে পরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা।
পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে আপনি ক্লাসের প্রেজেন্স গড় করে সেইমতো ফাইনাল পরীক্ষার মার্ক দিয়েছেন, খাতা দেখেননি, ফলে যে ছাত্র পরীক্ষার দিন অনুপস্থিত ছিল সে পাশ করে গেছে। যে ছাত্রর বাপকে আপনার কাজে লাগবে তাকে আপনি ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট বানিয়েছেন। যে ছাত্রর ডিজাইন আপনার পছন্দ হয়েছে আপনি তার ডিজাইন চুরি করেছেন। এবং আপনি আজকে আপনার এইসব কৃতকর্মের উপর দাঁড়িয়ে ভাবছেন, বুয়েটের এ কী হলো!

যেন শিক্ষকের অসততার, উদাসীনতার, অবিমৃশ্যকারিতার কত বড় ছাপ ছাত্রের জীবনে পড়ে, তা না জেনেই আপনি এতদূর এলেন তো, তাই না স্যার? এই যে যারা যারা আপনাদের কথা বলে দিচ্ছে এখন, সেইসব দুষ্টু ছেলেমেয়েদের শায়েস্তা করার কথা আপনি এখনো তো ভাবছেন তাই

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ